দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ইরানে ভূপাতিত হওয়ার পর উদ্ধার হওয়া এক মার্কিন বিমানসেনা প্রথমবারের মতো তার ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত জানিয়েছেন। রোববার সিবিএসের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ৬০ মিনিটসে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ওই অভিযানের নানা ঘটনা তুলে ধরেন।
পরিচয় গোপন রাখতে সাক্ষাৎকারে তাকে মিশনের সাংকেতিক নাম ব্রাভো নামে পরিচয় করানো হয়। তিনি জানান, এফ-১৫ যুদ্ধবিমানটি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর তার প্যারাশুট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটির দিকে দ্রুত পড়ে যাওয়ার সময় প্যারাশুটের ছেঁড়া অংশ খুলে দেওয়ার বা টেনে বের করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
ব্রাভো বলেন, এটি ছিল তার দেখা সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য। ওই পতনের সময় তার মেরুদণ্ড, একটি হাত ও কাঁধ ভেঙে যায়। এ ছাড়া গোড়ালিতে মচকানো এবং মাথা ও মুখে রক্তাক্ত ক্ষত হয়।
যুদ্ধবিমান থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর অস্ত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্রাভো ইরানি বাহিনীর নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন। গুরুতর আহত অবস্থায়ও তিনি প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু একটি পাহাড়ি এলাকায় উঠে যান। তার সঙ্গে ছিল সামান্য কিছু সরঞ্জাম—একটি পিস্তল, যোগাযোগের যন্ত্র এবং অবস্থান শনাক্তকারী সংকেতযন্ত্র।
এর আগে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, যুদ্ধবিমানের পাইলটকে দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে ব্রাভোকে উদ্ধার করতে সময় লাগে প্রায় ৫০ ঘণ্টা। নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশের আশঙ্কায় পেন্টাগন এখনো দুই বিমানসেনার পরিচয় প্রকাশ করেনি।
সিবিএসের সাংবাদিক নোরা ও’ডনেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ব্রাভো জানান, আত্মগোপনের জন্য নিরাপদ একটি জায়গা খুঁজে পাওয়ার পর তিনি যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করেন। নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করার সুযোগ পাওয়ার পর প্রথম যে বার্তাটি পাঠান, তা ছিল ঈশ্বর ভালো—এমন একটি বার্তা।
ব্রাভোর উদ্ধারের অভিযানটি ছিল বড় পরিসরের। তিনি জানান, একপর্যায়ে তিনি পাহাড়ের একটি সংকীর্ণ গিরিখাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লুকিয়ে ছিলেন। তাকে খুঁজে বের করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষিত সদস্যরা অভিযান চালান। তাদের সহায়তায় মার্কিন যুদ্ধবিমানও ওই এলাকায় বোমাবর্ষণ করে পথ নিরাপদ করে।
উদ্ধার অভিযানে শত শত মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সদস্য অংশ নেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স ও নৌবাহিনীর সিল টিম সিক্সের মতো বিশেষ বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন। এর আগে ব্রাভোকে ধরতে ইরানের পক্ষ থেকে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল বলে জানা যায়। তাকে আড়াল ও ইরানকে বিভ্রান্ত করতে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও আগাম একটি বিভ্রান্তিমূলক অভিযান পরিচালনা করেন।
সিবিএসের অনুষ্ঠানে পেন্টাগনের অবমুক্ত করা একটি ভিডিও দেখানো হয়। এতে মার্কিন বিমানবাহিনীর উদ্ধারকারী বিশেষ সদস্যদের ব্রাভোর অবস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। তবে উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে কী বলেছিলেন, তা জানাতে রাজি হননি ব্রাভো।
উদ্ধার অভিযানে আরও একটি জটিলতা তৈরি হয়। কমান্ডো ও উদ্ধার হওয়া বিমানসেনাকে ইরান থেকে বের করে নিতে অপেক্ষায় থাকা দুটি এমসি-১৩০জে বিশেষ অভিযান পরিবহন বিমান কোনো একপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ৯০ জনের বেশি বিশেষ বাহিনীর সদস্য সাময়িকভাবে সেখানে আটকা পড়েন। পরে তাদের উদ্ধার করা হলেও ইরানের হাতে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলো না পড়ে, সে জন্য মার্কিন বাহিনী সেগুলো ধ্বংস করে দেয় এবং নতুন বিমান পাঠানো হয়।
এদিকে ব্রাভোর সাক্ষাৎকার নিয়ে এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি হয়। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও তার দপ্তরের রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা দুই বিমানসেনাকে এই বহুল প্রচারিত সাক্ষাৎকারে অংশ নিতে চাপ দিয়েছিলেন। তবে পাইলট শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকারে অংশ নেননি।
সিএনএর ওই প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল। তিনি বলেন, সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল প্রত্যেক বিমানসেনার নিজস্ব এবং এটি তাদের গল্প। পাশাপাশি উদ্ধার অভিযান, উৎস ও পদ্ধতি সম্পর্কিত স্পর্শকাতর তথ্য সুরক্ষিত রাখতে প্রতিরক্ষা দপ্তর যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেছে।
ব্রাভো বলেন, পুরো ঘটনাটি তার জীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে যাবে। পাহাড়ের ওপর লুকিয়ে থাকার সময় উদ্ধারকারীদের দেখতে পাওয়ার মুহূর্তটিকে তিনি জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেন। তাদের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে এর চেয়ে স্পষ্ট কোনো ভাষা তার জানা নেই বলেও জানান তিনি।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/